সমাজের অন্তরালের মূক মহিলারা পেয়েছিলো একসময় গানের অধিকার । আর সেই অধিকার অর্জনের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল অমলা দাশ, সতী দেবী আর আঙুরবালার মতো শিল্পীদের দিয়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শাষনকে উপেক্ষা করে তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ,গান শুধু আমোদ-প্রমোদের জিনিস নয়। গান হোল মানুষের নিত্যদিনের সুখ ,দুঃখ আর বেদনার সঙ্গী। বাড়ির প্রভা এমনি করে একদিন চটকদারি আঙুরবালা নাম নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন গানের আসরে,রেকর্ড সঙ্গীত জগতে। নারীরা সেদিন থেকে পেয়েছিলো তাদের হারিয়ে যাওয়া সম্মান। প্রভার আঙুরবালা হয়ে ওঠার গল্প।
‘প্রভা ! ভিতরে আয়। তুই কি বাবার হাতে দড়ি না পরিয়ে ছাড়বিনে !’ আট বছরের মেয়ে প্রভা শুনে তো অবাক ! ‘কেন মা ? গান শুনলে কি পুলিশে ধরে নিয়ে যায় !’ মেয়ের নির্বুদ্ধিতায় জ্বলে যান মা। তারপর আঁচলের খুঁট থেকে বাউল ভিখিরি কে পয়সা দিয়ে বলেন ‘তুমি যাও বাপু, বাচ্চা কাচ্চা ঘর করি , বোঝো তো‘। প্রভা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তখনো গলির ভিতর থেকে ভেসে আসছে সেই গানের রেশ ‘একটি পয়সা দাওগো বাবু’ —প্রভার মনটা পড়ে থাকে।
‘প্রভা ! ভিতরে আয়। তুই কি বাবার হাতে দড়ি না পরিয়ে ছাড়বিনে !’ আট বছরের মেয়ে প্রভা শুনে তো অবাক ! ‘কেন মা ? গান শুনলে কি পুলিশে ধরে নিয়ে যায় !’ মেয়ের নির্বুদ্ধিতায় জ্বলে যান মা। তারপর আঁচলের খুঁট থেকে বাউল ভিখিরি কে পয়সা দিয়ে বলেন ‘তুমি যাও বাপু, বাচ্চা কাচ্চা ঘর করি , বোঝো তো‘। প্রভা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তখনো গলির ভিতর থেকে ভেসে আসছে সেই গানের রেশ ‘একটি পয়সা দাওগো বাবু’ —প্রভার মনটা পড়ে থাকে।
বাবা বিজলীভূষন
চান তাঁর মেয়ে ইংরেজী লেখাপড়া শিখে উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠুক। তাই মিশনারি স্কুলে
ভর্তি করিয়েছিলেন । কিন্তু তাতেও মায়ের মনে দুশ্চিন্তা যায়নি। নর্মাল স্কুলের
মিসের বেশ ভালো লাগে সাদামাটা এই মেয়েটাকে। তার থেকে আরো ভালো লাগে তাঁর মিস্টি
গলায় বাংলা শুনতে। প্রায় প্রভাকে ডেকে গান শোনেন আর পারিশ্রমিক হিসাবে প্রভা পায় এককাপ
গরম দুধ কিম্বা কোকো। এসব মায়ের যেন ভালো ঠেকতো না। কোনদিন তাঁর মেয়েটাকে খৃষ্টান না করে নেয়! বাবা বিজলীভূষন মনে মনে হাসেন। শেষমেস মিশনারি স্কুল
ছাড়িয়ে বেথুনে ভর্তি করানো পর্যন্ত হয় তাকে।
একদিন স্কুলে যাবার পথে নবকৃষ্ণ
স্ট্রিটের মিত্তির বাড়ির সামনে থমকে যায় প্রভা। সঙ্গে সহপাঠী আশা। ‘কিসের ভিড় রে আশা ?’ পায়ে পায়ে দু’জনে এগোয় গেটের দিকে।বুড়ো দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে ‘কি হয়েছে গো ? এতো ভিড় কেন?’ দারোয়ান বলে’ গানা হোতা খোকি , শুনবে তো যাওনা ভিতরে’। আশা পা বাড়ায় স্কুলের দিকে। প্রভা ছুটে গিয়ে তার হাত ধরে , বলে’ ‘চল্ না আশা, একটুখানি শুনে আসি’। আশা বলে ‘কি হবে গান শুনে ! দেরি হলে মিস্ বকবে না ?’। প্রভার মন ছটপট করে। কি করবে সে! বার বার আশাকে বলে ‘চল্না ভাই একটু শুনে ফিরে আসবো’ ।অগত্যা আশা প্রভার সঙ্গে যায়।ভিতরে গিয়ে আশা দেখে তো থ!! ‘ওরে বাবা ,বাক্সের মধ্যে বসে বিচ্ছিরি চোঙ
দিয়ে কে গান গাইছে ! ভুত নাকি ! কি গানের ছিরি “ ঠাকুরদা পেয়ারা খায়, কাঁচা খায় পাকা খায়, ডাঁসার তো কথা নয়’—খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে আশা।ততক্ষণে সে গান শুনে প্রভা আবিষ্ট
হয়ে পড়েছে। জানতে চায় ‘কে গাইছে গো?’ পাশ থেকে উত্তর আসে ‘লালচাঁদ বড়াল’।আশার আর ভালো লাগেনা। ছুটে বাইরে বেরিয়ে যায় সে। বলে ‘ তুই ওই লালকমল আর নীলকমলের গান শোন্ , আমি চললুম। প্রভাও তার পিছু পিছু বেরিয়ে আসে।
গানের জলসা প্রভাকে যেন আর পিছু ছাড়েনা। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায় গান শুনতে স্কুলের ফাঁকে। মায়ের মন
আর যেন সায় দেয়না। একদিন স্বামীর কাছে পাড়লেন নিজের মনের কথাটা । ‘আমাদের প্রভাটার গলাটা বড় মিস্টি, লেখাপড়ার সাথে একটু
গান শিখলে কেমন হয় ? বিজলীভূষন বল্লেন ‘গান শিখে কি হবে ?’ যে বাড়ির মেয়েয়া এক গলা ঘোমটা টেনে গঙ্গায় যায় সেই বাড়ীতে গান ! প্রভার গান শেখার শেষ আশাটুকু
যেন শেষ হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ইচ্ছে হয় বাবাকে
গিয়ে বলে সে ‘গান শুনলে, গান করলে রাগ কর কেন ?’ আমার যে বড্ড ভালো লাগে গান শুনতে, গান গাইতে !
তবে ভাগ্য কিছুটা অনুকুলে আসে ব্যানার্জি পরিবারের পারিবারিক বন্ধু অমূল্য মজুমদারের যাতায়াতে।অমূল্য মজুমদার গান জানেন
অল্প বিস্তর। প্রভার গানে ঝোঁক দেখে মাঝে
মাঝে তাঁকে নিয়ে বসতেন পুরোনো হারমনিয়মটা নিয়ে। বাবার মুখ তখন আঁধার হতো। তবুও
শুকনো গলায় অনুমতি দিতেন অমূল্যকে
। মেয়ের গান শুনে বাপের মনটা নরম হয়ে যায় একদিন। কিন্তু বেশিদিন থাকতে
পারেননি আর বিজলীভূষন নিজের বাড়িতে । যুদ্ধের ডাক আসে ।রওনা হন সুদুর মেসোপোটেমিয়ায়। যাবার আগে মেয়েকে কাছে
টেনে নিয়ে বলেন “অমূল্য তো রইলো , তোর যদি গান শিখতে ইচ্ছে হয় ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে‘। প্রভা খুশিতে উদ্বেল হয়ে ওঠে। সেই থেকে শুরু হয় প্রভার গানের
প্রথম প্রথাগত পাঠ । এলেন জিতু ওস্তাদ ।এরপর জমিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে উর্দু দাদরা ,গজল আর ঠুংরীর তালিম । মার্গ সঙ্গীতের
আসল তালিম শুরু হয় গোয়ালিয়র ঘরানার রামপ্রসাদ মিশ্রর কাছে। শুরু হয় গভীর সঙ্গীত সাধনা।ক্লান্তি নেই । বিরাম নেই।এরই
মধ্যে একদিন “হিজ মাস্টারস ভয়েস “ কোম্পানি থেকে এলেন মন্তাবাবু আর কে. মল্লিক । প্রভার গান রেকর্ড করবেন ।
![]() |
| জমিরুদ্দীন খাঁ |
প্রথমে যেতে রাজি হয়নি সে। পরে সবার অনুরোধে রাজি হয়ে যায়। অন্তত কোম্পানিটা তো দেখে আসা যাবে ! সবাই মিলে চলে আসেন বেলেঘাটার
রেকর্ডিং স্টুডিওতে। গিয়ে তো অবাক প্রভা ! ভয় ও করছে অনেকটা। সে যেন জবচার্নকের
প্রথম ইংরেজ কুঠির মতো ! টিনের শেড।ভেতরে একটা বড় টেবিল। টেবিল ঘেঁসে ঝোলানো রয়েছে কালো মোটা একটা পর্দা। পর্দার গা ফুটো করে মাঝখানে বসানো রয়েছে
চানাচুর ভাজার চোঙের মতো একট বড় চোঙ । টেবিলের ওপর বসানো একটা হারমনিয়ম।ভয়ে ভয়ে চোঙের সামনে এসে গান
গাইল প্রভা । বুঝতেই পারলো না কখন তার দুটো
গান রেকর্ড হয়ে গেছে। ‘বাঁধনা তরীখানি আমার এই নদীকুলে--
আর “কালা তোর তরে কদমতলায়’ (P 4721)। ভয়ও কাটলো যেন একটু । ১৯২১ সাল । কিন্তু ঘরের প্রভা
আঙুরবালা নামের আড়ালে আত্নগোপন করে দেখা দিল বাইরের জগতে।
![]() |
| রবীন্দ্রসদন মঞ্চে উপবিষ্ট যুথিকা রায়, আঙুরবালা দেবী, কানন দেবী, পঙ্কজ কুমার মল্লিক ও ভি.কে দুবে(বাঁ দিক থেকে) |
সুত্র- বেতার জগৎ




Comments
Post a Comment