রাত আড়াইটে । মাঘ মাসের শীতের রাত। সারা মহল্লা ঘুমে নিথর। শুধুমাত্র একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসছে শব্দের তরঙ্গ। পঁচিশ নম্বর ডিকসন্ লেনের বাড়িটি কিরণচন্দ্র ঘোষের। সঙ্গীতমহলে জ্ঞানবাবুর বাড়ী নামে পরিচিত। আগে বাস ছিল ক্রীক্ স্ট্রীটে। তারও আগে আমহার্স্ট স্ট্রীটে। ডোয়ার্কিনের স্বত্বাধিকারী দ্বারকানাথ ঘোষের পরিবারে গান
বাজনার চর্চা বহুদিনের। দুই পুরুষ আগেও বাড়িতে বাদ্যযন্ত্রের
বিরাট সমাবেশ ছিল। কাকা শরৎ ঘোষ বাজাতেন পিয়ানো। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এইভাবে বড় হয়ে
উঠেছে জমজমাট সঙ্গীতের পরিবেশে।পড়াশোনার ফাঁকে গানবাজনাতেও উৎসাহ
পেত তারা। বাজনা বাজাতো। গাইত রবিঠাকুরের গান। তবুও সবার মধ্যে একটি ছেলে যেন সবথেকে বেশি মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে আয়তনে নয়, স্বকীয়তায় আর বুদ্ধির স্ফুরনে। জ্ঞেনু। ছোট থেকেই তার ঝোঁক তালবাদ্যের দিকেই । অভিভাবকরা সচেতন। পাখোয়াজ শিখবে জ্ঞেনু । দীনু হাজরা মশাইয়ের ডাক পড়লো। তবলা চাই। টোনিবাবু আছেন। তিনিই শেখাতে শুরু করলেন। কিন্তু এতো শুধু ছন্দ ! সুর কই ? সুরের সন্ধানে নাড়াচাড়া চললো হারমোনিয়াম, অর্গান, গীটার, পিয়ানো, বেহালা নিয়ে।
তবে গানবাজনা নিয়ে থাকলে তো শুধু
হবেনা ! পড়াশোনাটাও করতে হবে। লেখাপড়ায় ও ভালো সে । গানের সাথে একটির পর একটি পরীক্ষার বেড়া উতরে
যাচ্ছে অনায়াসে ! বি .এ. পাশ করলেন। পালি ভাষা আর সাহিত্যের অনার্সে
প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থানটিও অধিকার করলেন । গান আর পড়াশোনার পাশে খেলাধুলার ও সখ ছিল খুব।একবার খেলতে গিয়ে চোখের জন্য মাঝপথে পড়া
ছাড়তে হয়। শেষ পরীক্ষাটা আর দিতে পারেননি জ্ঞানপ্রকাশ । কিন্তু এই দুঃসময়ের কাল বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে সবকিছু কাটিয়ে উঠেছিলেন ।মনের মধ্যে যে তৃষ্ণা
বিন্দু বিন্দু হয়ে জমে উঠেছিল তার নিবৃত্তির পথ তৈরি হয়ে উঠছিল ক্রমে ক্রমে।
বাংলাদেশে তখন গিরিজাশংকর চক্রবর্তী
এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের কাছে। তিনি ছিলেন একাধারে যশস্বী সঙ্গীতশিল্পী , মহা পণ্ডিত ও আদর্শ শিক্ষাগুরু। শিক্ষাদানে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁরই কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করলেন জ্ঞানপ্রকাশ। সাধনার আর খামতি নেই। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিলেন মেহেদী হোসেন খাঁ, মহম্মদ সগীর খাঁর কাছে। এমনকি ওস্তাদ খুশি মহম্মদের কাছে
হারমোনিয়াম শিক্ষার কলাকৌশলও বাদ দিলেন না। নিজেকে মেজে
ঘষে উজ্জ্বল করে তুলছেন নিয়মিত অনুশীলন আর চিন্তাশক্তি দিয়ে। একদিকে গান আর অন্যদিকে তবলার পাঠও নিচ্ছেন
মসিদ খাঁ, আজমীরের আজিম খাঁ আর পাঞ্জাবের
ফিরোজ খাঁর কাছে। রেওয়াজ চলছে জোর কদমে। এমনি ভাবেই সঙ্গীতের মধ্যে ডুবে যাচ্ছেন ক্রমে ক্রমে ।
দিবা রাত্রের চিন্তা, সাধনা, অধ্যয়ন সব মিলে এক নতুন দিগন্তের
সন্ধান এনেছিল জীবন জুড়ে । নিজের গানের সাধনা, সঙ্গীতশাস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে
গান কি ভাবে রসসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে সে বিষয়ে তাঁর চলতো নিরলস প্রচেষ্টা। তিনি ভাবতেন
গান গেয়ে যে সম্পদ তিনি লাভ করেছেন তা যদি উত্তরসুরীদের কাছে পৌঁছে না দেওয়া যায় তাতে সঙ্গীতের পরম্পরা বজায় থাকবে না ।সেখানে নিজের শিক্ষা অর্জন মুল্যহীন হয়ে পড়বে ।তাই সারা জীবনে নতুন শিল্পীদের
সঙ্গে নিয়ে সবসময় চলতেন। দূর বহুদুর থেকে তাঁর শিক্ষার্থীরা আসতেন তাঁর কাছে। বিপাকে-বিপদে
পড়লে সারাক্ষন পাশে থেকে সাহায্য করেছেন তাদের। নবাগত শিল্পীদের উন্নতির পথ
করে দেওয়া ছিল তাঁর মনের বাসনা । এমনিভাবে শিক্ষাদানের পাশাপাশি সামান্য অবসরে চলতো তাঁর নিজের সাধনা, গীতরচনা আর সুররচনা । এই দ্বৈত ভুমিকা তাঁর মনে এনে দিত এক
পরম তৃপ্তি।
![]() |
| তবলা-জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ |
![]() |
| ১৯৩২ সালের হিন্দুস্থান রেকর্ড ক্যাটালগ |
তবে
বাদ্যযন্ত্রী হিসাবে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানিতে যুক্ত থেকেও নিজের
সুরে গান বা স্বকণ্ঠে কোনোও গান রেকর্ড করতে পারছিলেন না।তবে জানা যায় জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুরের প্রতিভা প্রথম রেকর্ডে এলো এইচ. এম. ভি. থেকে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত মিস্ সুভাষিণীর গান দিয়ে। গান দুটি ছিল ‘তুমি শুধু গাও গান(গজল) /দিন কেটে যায় কি বেদনায়(রাগপ্রধান)[N 7162]।
এরপর তিনি ঐ বছরের শেষের দিকে তাঁর স্বকণ্ঠে গান রেকর্ড করেন এইচ. এম. ভি. থেকে প্রখ্যাত শিল্পী হরিমতীর সাথে।
![]() |
| এইচ.এম. ভি. প্রচার পুস্তিকা ১৯৩৩ |
![]() |
| জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের প্রথম রেকর্ড |
১৯৩৫ সালে শচীনদেব বর্মণ প্রথম প্লেব্যাক করেন ‘সাঁঝের
পিদিম’ ছবিতে। গীতিকবি অজয় ভট্টাচার্যর
কথায় সেই বিখ্যাত গান ‘ওরে সুজন নাইয়া/ নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে.. গানে গীটারের অনবদ্য
ঝংকার তুলেছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ।
১৯৩৬ সালে সাবিত্রী ঘোষ(চামেলী) হিমাংশু দত্তর সুরে প্রথম রেকর্ড করেন এবং সঙ্গীতমহলে সেই গান আলোড়ন সৃষ্টি করে। এইচ. এম. ভি. থেকে প্রকাশিত “নিশীথে চলে হিমেল বায়(কথা-মমতা মিত্র) /বেদনাতে বিজড়িত গান(কথা-বিনয় মুখোপাধ্যায়) ( N 9802) গান দুটির পিছনে গীটারে ছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ । হিমাংশু দত্তর কেবল এই দুটি গান নয়, তার বহু বিখ্যাত গানে যেমন 'আঁখিতে ভরিয়া জল, 'ফাগুন এলো বুঝি, 'ছিল চাঁদ মেঘের পরে, 'তোমারি পথপানে চাহি,'আকাশের চাদ মাটির ফুলেতে.. ইত্যাদি গানে তাঁর গীটার বাদন এক অসাধারন প্রতিভারই পরিচায়ক। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তিনি গীটার বাজিয়েছেন। ১৯৩৬ সালে একেবারে গোড়ার দিকে প্রকাশিত রবীন্দ্রমোহন বসুর গানে গীটার বাদক হিসাবে তাঁর নাম রেকর্ড লেভেলে জ্বলজ্বল করে লেখা আছে। গান দুটি ছিল তার মধ্যে ‘ হীমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে/রাঙিয়ে দিয়ে যাও ..(H 320).. রবীন্দ্রমোহন ছিলেন জ্ঞান ঘোষের প্রতিভার গভীর অনুরাগী । তাঁর প্রায় প্রতিটি গানের রেকর্ডে তবলা সঙ্গতে থাকতেন তিনি। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত সুরসাগরের ‘ নিতি রাতে কে ডাকে আমায়)[কথা- বিনয় মুখোপাধ্যায়]/বুঝি কথাটি মম(কথা- অজয় ভট্টাচার্য](H 561) রেকর্ড লেভেলে তবলাবাদকরূপে তাঁকে দেখা যায়। এছাড়া ১৯৩৬ সালে শচীনকর্তার গাওয়া সুরসাগরের সুরে 'মম মন্দিরে এল কে/নতুন ফাগুনে আজি(H 412) গান দুটিতেও তবলা সঙ্গতে ছিলেন তিনি.. এইভাবে তিরিশের দশকে সুরের সাথে যুক্ত থাকলেন প্রসিদ্ধ গীটার ও তবলাবাদকের প্রধান ভুমিকায়।
১৯৩৬ সালে সাবিত্রী ঘোষ(চামেলী) হিমাংশু দত্তর সুরে প্রথম রেকর্ড করেন এবং সঙ্গীতমহলে সেই গান আলোড়ন সৃষ্টি করে। এইচ. এম. ভি. থেকে প্রকাশিত “নিশীথে চলে হিমেল বায়(কথা-মমতা মিত্র) /বেদনাতে বিজড়িত গান(কথা-বিনয় মুখোপাধ্যায়) ( N 9802) গান দুটির পিছনে গীটারে ছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ । হিমাংশু দত্তর কেবল এই দুটি গান নয়, তার বহু বিখ্যাত গানে যেমন 'আঁখিতে ভরিয়া জল, 'ফাগুন এলো বুঝি, 'ছিল চাঁদ মেঘের পরে, 'তোমারি পথপানে চাহি,'আকাশের চাদ মাটির ফুলেতে.. ইত্যাদি গানে তাঁর গীটার বাদন এক অসাধারন প্রতিভারই পরিচায়ক। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তিনি গীটার বাজিয়েছেন। ১৯৩৬ সালে একেবারে গোড়ার দিকে প্রকাশিত রবীন্দ্রমোহন বসুর গানে গীটার বাদক হিসাবে তাঁর নাম রেকর্ড লেভেলে জ্বলজ্বল করে লেখা আছে। গান দুটি ছিল তার মধ্যে ‘ হীমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে/রাঙিয়ে দিয়ে যাও ..(H 320).. রবীন্দ্রমোহন ছিলেন জ্ঞান ঘোষের প্রতিভার গভীর অনুরাগী । তাঁর প্রায় প্রতিটি গানের রেকর্ডে তবলা সঙ্গতে থাকতেন তিনি। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত সুরসাগরের ‘ নিতি রাতে কে ডাকে আমায়)[কথা- বিনয় মুখোপাধ্যায়]/বুঝি কথাটি মম(কথা- অজয় ভট্টাচার্য](H 561) রেকর্ড লেভেলে তবলাবাদকরূপে তাঁকে দেখা যায়। এছাড়া ১৯৩৬ সালে শচীনকর্তার গাওয়া সুরসাগরের সুরে 'মম মন্দিরে এল কে/নতুন ফাগুনে আজি(H 412) গান দুটিতেও তবলা সঙ্গতে ছিলেন তিনি.. এইভাবে তিরিশের দশকে সুরের সাথে যুক্ত থাকলেন প্রসিদ্ধ গীটার ও তবলাবাদকের প্রধান ভুমিকায়।
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ প্রথম সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা করেন ১৯৩৬ সালের একটি স্বল্প দৈর্ঘের ছবি ‘কুহু ও কেকা’ তে ।প্রসঙ্গত এই ছবিতেই
কণ্ঠশিল্পী হিসাবে প্রথম আবির্ভাব হন বিষ্মৃতপ্রায় শিল্পী গৌরিকেদার ভট্টাচার্য ।যশোরের বিখ্যাত শিল্পী বেলারাণী সেন এবং তারাপদ ভট্টাচার্য এই সিনেমায় গেয়েছিলেন ’ মাধবী পূর্ণিমা
নিশিথে...(H 416) । ১৯৪৩ সালে নিতীন বসু পরিচালিত ‘ বিচার’ (১৯৪৩) ছায়াছবিতেও তিনি সুরা্রোপ করেন প্রনব রায়ের লেখা গানে । ছবিতে মুখ্য প্লেব্যাক শিল্পী ছিলেন
রাধারাণী(ছোট)। আর অন্যান্যরা ছিলেন ভারতী মজুমদার, বিজয়া দাশ প্রমূখ ।
![]() |
| জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ সুররোপিত ছায়াছবি ' বিচার' |
এবার তাঁর সুরারোপিত আরও কিছু গানের কথায় আসি। ১৯৩৪ সালে অন্ধগায়ক গোপালচন্দ্র সেন গাইলেন 'মন যে বলে চিনি চিনি/নিদহারা চাঁদ জাগে গগনে (N 7271), সত্যেন ঘোষাল গাইলেন 'আসিবে কি ফিরে সখি(কথা-নীলমণি ঘোষ)/স্বপনে দেখিনু(কথা-জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ) । ১৯৩৭ সালে নীলমণি সিংহ র গাওয়া কাজী নজরুল ইসলামের ' আদরিণী মোর কালো মেয়েরে [আদরিণী মোর শ্যামা মেয়েরে](N 9853] গানেও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
এছাড়া পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাঁর সুরে গাওয়া দুজন শিল্পীর গান উল্লেখ করতেই হয়। একজন তাঁর সহধর্মিনী ললিতা ঘোষ। মেগাফোন রেকর্ড থেকে ১৯৬২ সালে ললিতা ঘোষ গেয়েছিলেন ' রাধে কৃষ্ণ বল (কথা- গোপাল দাশগুপ্ত)/চল মন গঙ্গা যমুনা তীর(কথা-জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ) [JNG 6120] আর ১৯৬৩ সালে ‘গান আমার পরশমনি(কথা-জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ) ,আর উল্টোপিঠে ’ সারা বেলা ধরে ,কানে কানে মোরে (কথা- শ্যামল গুপ্ত)[JNG 6139] । এছাড়া তাঁর গাওয়া 'পিয়া পিয়া বোলে(শ্যামল গুপ্ত)/এ কি আনন্দে দোলে এ জীবন (কথা-পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়) [JNG 6202] আজ প্রায় অধরাই থেকে গেছে সাধারন শ্রোতার কাছে। আরেকজন হলেন বাণী কোনার(সরকার) । কলম্বিয়া রেকর্ড থেকে প্রকাশিত ' কোয়েলিয়া গান থামা(রাগপ্রধান) /‘কূল ছেড়ে এসে মাঝ দরিয়ায় ..(১৯৫৪).([GE 24716] এবং 'আনন্দ ভরা এই সুন্দর ভুবনে(কথা-জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ)/ আজি দুখ নিশিভোর(কথা- জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ)[ GE 24787] সঙ্গীতরসিক শ্রোতা এবং শিল্পীদের কাছে এখনোও সমান ভাবে সমাদৃত।
![]() |
| একটি বিশেষ রেকর্ড: শিল্পী- মানবেন্দ্র মুখার্জী, প্রতিমা ব্যানার্জী ও বাণী ঠাকুর |
দ্রঃ এই নিবন্ধের কোনও অংশ ভবিষ্যতে কেউ ব্যবহার করলে তা লেখকের অনুমতিসাপেক্ষ











Comments
Post a Comment